বিএসএফের বর্বরতানির্যাতনের ভিডিও ক্লিপটি মনমোহনের টেবিলেশর্ষের মধ্যে ভূত, তাই এদের সাজা দেওয়ার কেউ নেই : শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
শুধু তা-ই নয়, মানবাধিকার সংস্থা মাসুম (মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ) মুর্শিদাবাদের সীমান্ত অঞ্চলে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়া নির্মম অমানবিক সেই ভিডিও ফুটেজটিও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ই-মেইল করে পাঠায় এদিন।
এ ছাড়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্য সচিব সমর ঘোষসহ স্বরাষ্ট্রসচিব এবং রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের কাছেও ওই সংগঠনটি অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে ই-মেইল পাঠায়। সেখানেও ভিডিও ফুটেজটি সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তরফে পাঠানো এসব চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, দেশের একজন সাধারণ নাগরিক এ ধরনের অপরাধ করলে যদি পুলিশ গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে, সে ক্ষেত্রে একজন মানুষকে এভাবে নগ্ন করে পেটানোর পরও কেন বিএসএফ সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়নি? শুধু তা-ই নয়, সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়, একজন বাংলাদেশি পাচারকারীকে ধরে পেটানোর পর কেন তাকে পুলিশে দেওয়া হলো না? এখানেও বিএসএফ আইন লঙ্ঘন করেছে।
এদিকে রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের অ্যাক্টিং চেয়ারপারসন বিচারপতি নারায়ণ শীল বলেন, 'এখনো লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ আমার দপ্তরে জমা পড়েনি। বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আওতাভুক্ত। আমাদের কাছে এলে সেটা সেখানে পাঠিয়ে দেব।'
ভারতের মানবাধিকার সংগঠন মাসুমের সেক্রেটারি কিরিটি রায় জানিয়েছেন, 'এই ঘটনায় শুধু প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতির কাছেই নয়, আমরা জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সেলেও চিঠি পাঠিয়েছি। সেখানেও ভিডিও ক্লিপ দেওয়া হয়েছে। বিএসএফ একের পর এক নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে। এটা শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘনই নয়; বরং ভারতীয় সংবিধান পরিপন্থী। কিন্তু দুঃজনক হলেও সত্য, বিএসএফের বিরুদ্ধে কোনো আইন প্রয়োগ করা হয় না। এ কারণে তারা যা ইচ্ছা করে পার পেয়ে যাচ্ছে।'
কলকাতার সুশীল সামাজেও এই বর্বরতার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর ভাষ্য, জঘন্য একটি কাজ করেছে বিএসএফ। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। নইলে এ ধরনের অপরাধ আরো বাড়বে। তিনি এর জন্য বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে এগিয়ে এসে এসব ঘটনা প্রচার করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সভ্য সমাজে এ ধরনের আক্রমণ মেনে নেওয়া অসম্ভব।
বিএসএফের এই ঘটনা আসলে টাকাপয়সার লেনদেনের কারণে হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন আরেক প্রখ্যাত লেখক ও কবি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তাঁর ভাষায়, 'কতিপয় বিএসএফ টাকা না পেলেই এই কাজ করে। সীমান্তে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়, এর সিংহভাগই বিএসএফের জানা। কিন্তু আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে এমন হচ্ছে। আইন কে প্রয়োগ করবে বলুন? আসলে শর্ষের মধ্যেই ভূত আছে। যাঁরা আইন প্রয়োগ করবেন, তাঁরাই তো দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।'
মুর্শিদাবাদের স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান হোসেন বলেন, এমন অত্যচারের ঘটনায় তাঁরা রীতিমতো লজ্জিত। এতে দেশের মানুষের সম্পর্কে প্রতিবেশীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছায়। এ ঘটনা তিনি দেশের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির কাছে লিখিতভাবে জানাবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রায় সব বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা মুর্শিদাবাদের বিএসএফের এই অত্যাচারের খবর প্রকাশ করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমেরিকার গুয়ান্তানামো বে কারাগারের লোমহর্ষক নির্যাতনকেও হার মানিয়েছে বলে কোনো কোনো দৈনিক পত্রিকা মত প্রকাশ করেছে।
কলকাতার অধিকাংশ পত্রিকার দাবি, বিএসএফ জওয়ানদের চাহিদামতো টাকা না দেওয়ায় এভাবে বাংলাদেশি পাচারকারীদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। একইভাবে ৯ ডিসেম্বর ধৃত পাচারকারী হাবিবুর রহমানের কাছেও টাকা চাওয়া হয়েছিল। দাবিমতো ওই টাকা না দেওয়ায় এই নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে বিএসএফ।
এদিকে প্রশ্ন উঠেছে ভিডিও ফুটেজ তোলা নিয়ে। সীমান্তে কতর্ব্য পালনের সময় কোনো বিএসএফ সদস্যের হাতে মোবাইল থাকা নিষিদ্ধ। কিন্তু সেদিনের এই দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছে মোবাইল ফোনে। শুধু তা-ই নয়, গরু পাচারের অভিযোগে ধৃত ও নির্যাতিত ওই বাংলাদেশি এখন কোথায়? বিএসএফ ধরলে তাকে অবশ্যই পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা। তাহলে সেদিন কেন বিএসএফ অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে আটক হওয়ার পরও সেলিম খানকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়নি? এখানেও ওই বিএসএফ সদস্যরা দেশের আইন ভঙ্গ করেছে। গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে বলে বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গের সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।

0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন