শুক্রবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১১

বলিউডের নতুন 'আর কে '


বলিউডের নতুন 'আর কে'

আর কে- এই দুটি মাত্র অক্ষরের সঙ্গে মিশে আছে শত বছরের ঐতিহ্য। কাপুর খানদানের গোড়াপত্তন পৃথ্বিরাজ কাপুরের হাত ধরে। তারই দেখানো পথে তার ৩ সুযোগ্য পুত্র রাজ কাপুর, শাম্মী কাপুর এবং শশী কাপুর হিন্দী ছবির জগতে অভিনয়কে নিয়ে গেছেন এক অন্য উচ্চতায়। এদের মধ্যে রাজ কাপুরের বংশধররাই আজও বলিউডে বহন করে চলেছেন কাপুরদের পারিবারিক সেই ঐতিহ্য। আর সেখান থেকেই এই আর কে নামের উৎপত্তি। রাজ কাপুর, রণধীর কাপুর, ঋষি কাপুর, রাজীব কাপুর- বলিউডের প্রায় প্রতিটি যুগকেই স্বর্ণময় করে তোলার দায়িত্ব যেন নিজেদের হাতেই তুলে নিয়েছিলেন এই আর কে’রা। সর্বশেষ ঋষি কাপুরের ছেলে রণবীর কাপুর অর্থাৎ আরেক আর কে’র প্রতিও যে বলিউডবাসীর প্রত্যাশা সেরকমই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 


দেখতে ভালো, ভালো নাচতে জানেন, অভিনয়ে পারদর্শিতা আছে, আবার নায়িকাদের সঙ্গে অনস্ক্রিন-অফস্ক্রিন সব রকমের রসায়নেই ওস্তাদ- বলিউডের রঙিন দুনিয়ায় একজন অভিনেতার তারকা হয়ে ওঠার সবচেয়ে সহজ ফর্মুলা এগুলোই। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত পরিবারের ছেলে হিসেবে রণবীরের মধ্যে এর সবই আছে। তাই তারকা হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে এই চকোলেট বয়ের সময় না লাগারই কথা। কিন্তু ছেলেটির নামের শেষের উপাধিটি যে কাপুর! টিনসেলের অন্যতম অভিজাত পরিবারের সদস্য এই ছেলেটির ঘাড়েই যে এসে পড়েছে বলিউডের বিখ্যাত আর কে নামের পরম্পরাকে ধরে রাখার গুরু দায়িত্ব। তাই কেবল নিছক সস্তা তারকাখ্যাতি দিয়েই চলবে না, নিজের মেধা ও অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে শরীরে বয়ে যাওয়া এই রাজ রক্তের সম্মান রাখতে হবে যে কোনো মূল্যেই। ৪ বছর আগে রূপালি জগতে পা রাখা এই তরুণ কী আসলেই পেরেছেন তার নামের প্রতি সম্মান রাখার এই পরীক্ষায় পাস করতে?


প্রশ্নটি কঠিন শোনালেও আজ অর্থাৎ ২০১১ সালে এসে এর জবাব দেওয়াটা খুবই সহজ। গত ৪ বছরে রণবীর কেবল নিজের হিট ছবিগুলোকে পুঁজি করে নতুন প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় তারকাতেই পরিণত হননি, হিট-ফ্লপ সবক’টি ছবিতেই নিজের অভিনয় প্রতিভাকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন বলিউডের নতুন এবং সবদিক থেকেই যোগ্য আরকে তিনিই। আর তাইতো অনেকেই বলিউডের সব মুঘলদের চেয়ে ২৮ বছরের এই তরুণের ওপরেই তাদের বাজীর পাল্লাটা ভারী করে দিতে দ্বিধা করেন না। 


রণবীর নিজেও সবসময় বলে এসেছেন, তিনি তার আর কে নামের প্রতি সুবিচার করতে চান।


রূপালি জগতে নিজের জায়গা বানিয়ে নেওয়ার স্বপ্নও তিনি দেখতে শুরু করেছিলেন সেই ছোট্টটি থাকতেই। তার ভাষায়, ‘আমি সবসময়ই রূপালী জগতের একজন হতে চেয়েছিলাম। আপনি যখন এমন কোনো পরিবেশে বড় হবেন যেখানে সবাই সারাক্ষণ কথাই বলেন চলচ্চিত্র নিয়ে, তখন আপনার মনেও অবশ্যই ইচ্ছা হবে তাদের মতো একজন হওয়ার। আমিও ছবি নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করতাম, আয়নার সামনে দাঁড়ালে সেই ছোটবেলা থেকেই আমি ছবির সংলাপ আওড়াতাম, পছন্দের তারকাদের মতো করে অভিনয় করার চেষ্টা করতোম। তবে এত কিছুর মধ্যে ঠিক কবে যে আমি অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম, তা আমি নিজেও জানি না। আমার প্রাথমিক ইচ্ছা ছিলো ছবি পরিচালনা করার, ছবিতে অভিনয়ের নয়।’


আর তাইতো বাবা ঋষি কাপুর এবং মা নীতু সিং কাপুরের এই আদরের ছেলেটি পড়াশোনার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন দৃশ্য শিল্পকে। নিউ ইয়র্কের লি স্ট্রসবার্গ থিয়েটার অ্যান্ড ফিল্ম ইন্সটিটিউটে তিনি তার পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দেশে ফিরেই হয়ে গেলেন বিখ্যাত পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনসালীর মাস্টারপিস ‘ব্ল্যাক’-এর সহকারি পরিচালক। নিজের এই সুদর্শন সহকারি পরিচালকটিকেই পরবর্তী ছবি ‘সাওয়ারিয়া’র নায়ক হিসেবে মনোনীত করে ফেললেন বনসালী। নায়িকা হিসেবেও নিলেন আরেক কাপুর, অনিল কাপুর তনয়া সোনম কাপুরকে। ছবিটি ফ্লপ হলেও দর্শক-সমালোচক সবার মনেই জায়গা করে নেন রণবীর। ২০০৭ সালের ফ্লপ এই ছবিটির একমাত্র ইতিবাচক দিক হিসেবে সবাই স্বীকার করে নেন রণবীরের অভিনয়কে। আর তাইতো সেবছরের হিট ছবি ‘জানে তু ইয়া জানে না’- এর ইমরান খানকে পেছনে ফেলে সেরা নবাগত অভিনেতার সবকটি পুরস্কারই বগলদাবা করেছিলেন নতুন এই আর কে।     


এর পরের ছবি নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটু কৌশলী সিদ্ধান্তই নিলেন রণবীর। নাচে-গানে ভরপুর মশলাদার ছবি ‘বাচনা অ্যায় হাসিনো’তে বিপাশা বাসু, দীপিকা পাড়ুকোন এবং মিনিশা লাম্বা- ৩ নায়িকার বিপরীতে পুরোদস্তর প্লেবয় চরিত্রে অভিনয়ই রণবীরকে এনে দেয় তার কাক্সিক্ষত জনপ্রিয়তা। ছবির ‘খুদা জানে’ গানটিতে রণবীর-দীপিকার অসাধারণ রসায়ন মুহূর্তেই তাদেরকে বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় জুটিতে পরিণত করে। ‘সাওয়ারিয়া’র ব্যর্থতার পর ‘বাচনা অ্যায় হাসিনো’র সফলতা যেন রণবীরের ক্যারিয়ারকে একরকম নতুন জীবনই দিয়ে দেয়।                        


রণবীরের পরের ছবি ‘ওয়েক আপ সিড’ মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। নতুন পরিচালক আয়ান মুখার্জীর ভিন্ন ধাঁচের অফট্র্যাক ছবিটিতে নেই সেরকম নাচ-গান কিংবা মশলাদার মারামারি। নায়িকা কঙ্কনা সেন শর্মাও সে অর্থে গ্ল্যামারাস নন। তারপরও ছবিটি ব্যাপক সাড়া ফেললো। মাঝারি বাজেটে নির্মিত এই সাদামাটা ছবিটিই বড়মাপের ব্যবসা করলো। তরুণ প্রজন্ম বড়লোক বাবার অলস প্রকৃতির নিষ্কর্মা ছেলে সিডের চরিত্রে রণবীরকে দারুণ পছন্দ করলো। ছবিটির মাধ্যমে রণবীর প্রমাণ করলেন, অভিনেতা হিসেবে তার বৈচিত্র্যপূর্ণ সামর্থ কতটা বেশি। 


২০০৯ সালে এসে রণবীর আবারো প্রবেশ করলেন মশলাদার ছবির জগতে। ‘আজব প্রেম কি গজব কাহানি’ ছবিতে ক্যাটরিনা কাইফের সঙ্গে তার আদুরে রসায়ন মুগ্ধ করলো সবাইকে। মুক্তির পর ছবিটি যে পরিমাণ ব্যবসা করে, তা হতভম্ভ করে দেয় খোদ রণবীরকেও। তখন পর্যন্ত এটিই ছিলো রণবীরের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবি। একই বছর মুক্তি পায় ‘রকেট সিং: সেলসম্যান অফ দ্য ইয়ার’।
 যশরাজদের ব্যানারে মুক্তি পাওয়া ছবিটি স্রেফ সঠিক প্রচারণার অভাবেই দর্শকদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারেনি। আর তাই ছবিতে রণবীরের অসাধারণ অভিনয় সত্ত্বেও বক্স অফিস থেকে আশানুরূপ ফল মেলেনি। 




২০১০ সালে মুক্তি পায় রণবীরের অভিনয়জীবনের প্রথম ব্লকবাস্টার ছবি ‘রাজনীতি’। অজয় দেবগন, নানা পাটেকার, মনোজ বাজপেয়ী, অর্জুন রামপাল এবং ক্যাটরিনা কাইফের মতো তারকা থাকার পরও ছবিটির প্রাণ ছিলেন রণবীর। ‘রাজনীতি’র মাধ্যমেই রণবীর তার চিরাচরিত ‘লাভার বয়’ খোলস ছেড়ে প্রথমবারের মতো সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করলেন। মূলত এই ছবিটির মাধ্যমেই রণবীর তার প্রজন্মের তারকাদের থেকে নিজের জাত আলাদা করে চিনিয়ে দিলেন। বছরের শেষ দিকে মুক্তি পায় রণবীর-প্রিয়াংকা জুটির ‘আনজানা আনজানি’। এই ছবিতেও রণবীরের সাবলীল অভিনয় প্রশংসিত হয়। 
রণবীরের অভিনয় জীবন যতটা পরিচ্ছন্ন, বিতর্কবিহীন এবং প্রশংসিত, ব্যক্তিগত জীবন ঠিক ততটাই অগোছালো, বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ। আর এতসব বিতর্ক এবং প্রশ্নের পুরোটুকুই নারীঘটিত। অনস্ক্রিনের এই ‘লাভার বয়’ বাস্তব জীবনেও এই একই ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয়ে এসেছেন তার ক্যারিয়ারের একদম গোড়া থেকেই। শুরু থেকেই তার নামের পাশে বসেছে সোনম, দীপিকা, ক্যাটরিনা, প্রিয়াংকা এমনকি হালের নার্গিস ফাকরির নাম।

রণবীরের ‘লাভার বয়’ ইমেজের শুরু ২০০৭ সালে ‘সাওয়ারিয়া’র সেটে। নিজের প্রথম নায়িকা সোনমের সঙ্গে সিনেমার পর্দায় তো বটেই, পর্দার পেছনেও রোমান্সে জড়িয়ে পড়েছিলেন রণবীর। কিন্তু বক্স অফিসে ‘সাওয়ারিয়া’র ব্যর্থতার মতোই প্রেমেও ব্যর্থ হলো এই জুটি। ছবি শেষ, প্রেমও শেষ- এভাবেই সোনম-রণবীর অধ্যায়ের ইতি ঘটলো।

এরপর রণবীরের জীবনে আগমন দীপিকার। ‘বাচনা অ্যায় হাসিনো’র সেটে দুজনের প্রেমের সম্পর্ক এতটাই গভীরতা লাভ করলো যে, তারা জনসমক্ষেই নিজেদের প্রেমের বিষয়টি স্বীকার করে নিলেন। দীপিকাতো ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে নিজের ঘাড়ে আরকে নামের ট্যাটুও খোদাই করে ফেললেন। কিন্তু দীপিকার এই প্রেমকে তুচ্ছ করে রণবীর মজে গেলেন ক্যাটরিনার রূপে। রণবীরের এই ক্যাটরিনা প্রীতি এতোই বেড়ে গেল যে তা শেষমেষ দীপিকাকে দূরে ঠেলে দিলো।
ততোদিনে ‘রাজনীতি’র সেটে ক্যাট-বীর প্রেম তুঙ্গ স্পর্শী হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর মধ্যে বাগড়া দিয়ে বসলেন সালমান খান। নিজের এতদিনের প্রেমিকা এভাবে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে- ব্যাপারটা সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না খান সাহেব। তাই রণবীরকে একরকম হুমকি দিয়েই ক্যাটের পাশ থেকে সরিয়ে দিলেন তিনি। রণবীরও বুদ্ধিমানের মতো ‘দাবাং’ সালমানের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়াটাকে ভালো হবে না বুঝতে পেরে ক্যাটের সঙ্গে প্রেমের ইস্তফা দিলেন। একাকী রণবীর সঙ্গ খুঁজেছিলেন প্রিয়াংকা চোপড়ার মাঝেও। কিন্তু শাহিদ-প্রিয়াংকার ভাঙা প্রেম জোড়া লাগায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি তিনি। বেশ কিছুদিন একাই কাটিয়েছেন এই প্রেমিক পুরুষ। অবশ্য এই শূন্যতা খুব দ্রুতই পূরণ করে দিয়েছেন ‘রকস্টার’ ছবির সহ-তারকা নার্গিস ফাকরি। শোনা যাচ্ছে দুজনে এখন চুটিয়ে প্রেম করে সময় কাটাচ্ছেন।
রণবীর বরাবরই সবকিছুর উর্ধ্বে নিজের পরিবারকে স্থান দিয়েছেন। এখনও মা নীতু সিংয়ের কাছে তিনি সেই ছোট্ট রণবীরই। মায়ের আদরের এই ছেলে নিজে উপার্জন করা শুরু করলেও, এখনও নিয়মিত তার সাপ্তাহিক পকেটমানি ১৫০০ ভারতীয় টাকা আদায় করতে ভোলেন না। শত ব্যস্ততার মাঝেও বাবা ঋষি কাপুরের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা মারেন। আর সময় পেলেই বোন রিধিমা সাহনীর সঙ্গে সময় কাটিয়ে আসেন। অবসরে বই পড়তে ভালোবাসেন রণবীর; বিশেষ করে বিখ্যাতদের জীবনী তাকে খুবই অনুপ্রাণিত করে।
নিজের অভিনয় নিয়ে অসম্ভব আন্তরিক এই অভিনেতা সবসময়ই চেষ্টা করেন নিজেকে আরো উন্নত করার। যখনই কোনো ভালো ছবি দেখেন, সেই ছবির খুঁটিনাটি বিশেষ করে অভিনয় অনেক বেশি খেয়াল করে দেখেন তিনি। কোনো নির্দিষ্ট অভিনেতা নয়, বরং যেকোনো ছবির যেকোনো ভালো অভিনয়কেই নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন রণবীর। এসব থেকেই প্রতিনিয়ত অভিনয় শিখছেন বলেই মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘যতবার কোনো ভালো অভিনয় দেখি, প্রতিবারই নিজেকে বিপন্ন মনে হয়। এটা আমাকে আরো ভালো কিছু করার জন্য ঠেলে সামনে নিয়ে যায়। অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু করে দার্শিল সাফারি- প্রত্যেককেই আমার প্রতিদ্বন্দী মনে হয়। সব অভিনেতার ভালো অভিনয়ই আমার প্রতিদ্বন্দী। এভাবেই আমি শিখছি এবং এভাবেই এটি চলতে থাকবে।’

রূপালি জগতের এই আজীবনের শিক্ষার্থী গত ৪ বছরে ৭টি ছবিতে অভিনয় করে একটি ব্লকবাস্টার হিট, একটি সুপারহিট, দুটি হিট, একটি সেমি হিট এবং দুটি ফ্লপের মালিক হয়েছেন। বক্স অফিসের রিপোর্ট কার্ডে তাই চোখ বন্ধ করেই পাস মার্কের অনেক বেশি ওঠাতে পেরেছেন রণবীর কাপুর। আর অভিনয়ের দিক থেকে মূল্যায়ন করতে হলে গোল্ডেন এ প্লাস সবার কাছ থেকেই এরই মধ্যে পেয়ে গেছেন তিনি। অন্তত দুই যুগেরও বেশি অপেক্ষার পর বলিউড আবারো ভাসছে ‘আরকে’ কারিশমায়।



0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন