শুক্রবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১১

বাবলী থেকে মাধুরী


বাবলী থেকে মাধুরী

নিজের গুণেই তিনি চলচ্চিত্রমোদীদের কাছে অতি পরিচিত একজন। সব বয়সী নারী-পুরষের কাছেই সমান জনপ্রিয়। আশি এবং নব্বইয়ের পুরো দশক জুড়ে তিনি হিন্দি সিনেমার জগতে নিজেকে শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেখেছিলেন। বলিউডি টিনসেলে তাকে নিয়ে কম জল্পনা-কল্পনা হয়নি। পুরো ইন্ডাস্ট্রি তার জ্বরে এক সময় কেঁপেছে। তিনি ছিলেন চিত্রকর প্রয়াত মকবুল ফিদা হুসেনের ‘ড্রিম গার্ল’- মাধুরী দীক্ষিত। বিখ্যাত এই ‘মাধুরী’ নামটি কিন্তু তার বাবা-মা রাখেননি, রেখেছিলেন নির্মাতা সুভাষ ঘাই। মাধুরী হওয়ার আগে তার নাম ছিলো বাবলী দীক্ষিত।
১৯৬৭ সালের ১৫ মে মুম্বাইয়ে এক মারাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মাধুরী। বাবা শংকর ও মা স্নেহলতা দীক্ষিত। ডিভাইন চাইল্ড হাই স্কুলে পড়া-লেখার প্রথম পাট চুকিয়ে ভর্তি হন মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। হতে চেয়েছিলেন মাইক্রোবায়োলজিস্ট, কিন্তু শেষতক সেটা আর হয়নি। মাধুরী হয়ে গেছেন পুরোদস্তুর অভিনেত্রী। 

১৯৮৪ সালে ‘অবোধ’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে মাধুরীর। তবে ১৯৮৮ সালে ‘তেজাব’ ছবির ‘এক দো তিন’ গান দিয়েই মূলত তার সঙ্গে বেশি করে হৃদ্যতা তৈরি হয় মানুষের। পরবর্তীতে, ‘রাম লক্ষণ, কিষাণ কানাইয়া, দিল, বেটা, সাজন, খলনায়ক, হাম আপকে হ্যায় কৌন, দিল তো পাগল হ্যায়’সহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করে সমাদৃত হয়েছেন। জিতেছেন অসংখ্য পুরস্কারও।     

১৯৯০ সালে আমির খানের সঙ্গে ‘দিল’ ছবিতে অভিনয় করেন মাধুরী। এই অভিনয়ই তাকে এনে দেয় ক্যারিয়ারের প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে। মুক্তির পর সেটি ভারতে ৬৫ কোটি এবং বহির্বিশ্বে ১৫ কোটি ভারতীয় টাকা আয় করে। ছবিটি মাধুরীকে ৩য় বারের মতো ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এনে দেয়।
২০০০ সালে মকবুল ফিদা হুসেন পরিচালিত ‘গজগামিনী’ ছবিতে মাধুরীর বহুমুখী অভিনয় মানুষের মনে তার আসন অনেক বেশি দৃঢ় করেছে। এই চলচ্চিত্রে তাকে একাধারে গজগামিনী, সংগীতা, শকুন্তলা, মনিকা এবং মোনালিসা চরিত্রে দেখা গেছে।
২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বনসালির ‘দেবদাস’ ছবিতে শাহরুখ খান এবং ঐশ্বরিয়া রাইয়ের সঙ্গে অভিনয় করেন মাধুরী। এই ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে সেরা সহ-অভিনেত্রীর পুরস্কারও লাভ করেন। ছবিটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলো এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবেও মনোনয়ন পেয়েছিলো

২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ‘রেডিফ’ মাধুরী দীক্ষিতকে বলিউডের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা অভিনেত্রী হিসেবে ঘোষণা করে। হিন্দী সিনেমায় অনবদ্য ভূমিকা রাখার জন্য ২০০৮ সালে ভারত সরকারের ৪র্থ সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার হিসেবে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন এই গুণী অভিনেত্রী।

কত্থক নৃত্যশিল্পী হিসেবে ৮ বছরের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাধুরী। পরবর্তীতে এই প্রশিক্ষণ অনেক বেশি সহায়ক হয়েছে তার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের জন্যও। মাধুরী কেবল তার অভিনয়
দক্ষতার জন্যই পরিচিত নন, তার অসাধারণ নাচের পারদর্শিতাও সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। কত্থক নৃত্যগুরু পণ্ডিত বিরজু মহারাজের কোরিওগ্রাফিতে ‘দেবদাস’ ছবিতে নেচেছিলেন তিনি। তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন বিরজু মহারাজ। তিনি বলেছিলেন, ‘মাধুরী সবরকম নাচই সাবলীলভাবে নাচতে পারেন। এদিক থেকে বিবেচনা করলে তিনিই বলিউডের সেরা নৃত্যশিল্পী।’

১৯৯৯ সালে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কার্ডিওভাস্কুলার সার্জন শ্রীরাম মাধব নেনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন মাধুরী। আর তার পরপরই অভিনয় ছেড়ে দিয়ে স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারে পাড়ি জমান। সেসময় তিনি বলেছিলেন, ‘সাংসারিক জীবনে ব্যস্ততার জন্যই আর সিনেমায় অভিনয় করা সম্ভব হচ্ছে না আমার পক্ষে।’ সেই সময়টায় সংসার, বাচ্চা মানুষ করার মধ্য দিয়ে একেবারে সাধারণ নারীর মতো জীবন-যাপন করতে চেয়েছিলেন এই বলিউডি ডিভা। নিজের সম্পর্কে তিনি ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারি। তারকা বলেই যে আমাকে সবার চেয়ে আলাদা থাকতে হবে- এমনটা আমি কখনো ভাবিনি। আমি আসলে খুবই সাদাসিধে একজন মানুষ। আমি আমার পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সময়টুকু আনন্দের সঙ্গে কাটাতে চাই। কোথায় আমাকে কীভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে- এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমি সব ধরনের পরিস্থিতি উপভোগ করতে পারি।’


অভিনয়কে বিদায় জানিয়ে মারাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে শ্রীরাম নেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পুরদস্তুর সাংসারিক জীবন শুরু করেন পর্দা কাঁপানো এই বলিউডি অভিনেত্রী। তাদের ঘরে আসে দুটি সন্তান। কলোরাডোতে ২০০৩ সালে অরিন এবং ২০০৫ সালে রায়ানের জন্ম দেন মাধুরী। সেই সময়টাতে তিনি সংসার সামলাতে আর সন্তানদের লালন-পালন করতেই বেশি সময় দিয়েছেন। তবে মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেননি। মাঝে মাঝে সময়-সুযোগ করে ছোট পর্দায় এবং বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন। কিন্তু অভিনয় যার রক্তে মিশে আছে সেই জাতশিল্পীকে তো আর এই জগৎ থেকে দূরে রাখা যায় না। তাই শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালে নির্বাসন ভেঙ্গে মাধুরী আবারো ফিরে আসেন বলিউডের মায়াভরা দুনিয়ায়। অভিনয় করেন ‘আজা নাচ লে’ ছবিতে। ছবিটি খুব বেশি দর্শক সাড়া না পেলেও, বরাবরের মতো মাধুরীর অভিনয় প্রশংসিত হয় সব মহলেই।

মাধুরী চলতি বছরে ড্যান্স রিয়েলিটি শো ‘ঝলক দিখলা জা ৪’-এ বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন টানা ৩ মাস। ঐ সময় থেকেই তার কাছে অভিনয়ের জন্য অজস্র প্রস্তাব আসতে থাকে।
মাধুরী ভক্তদের জন্য সুসংবাদ হলো ১০ বছর পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজের দেশেই ফিরে এসেছেন তিনি। এখন থেকে তিনি মুম্বাইয়ে স্থায়ীভাবেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসবাস করবেন। চলতি বছর অক্টোবরের ২য় সপ্তাহে দেশের মাটিতে পা রেখে মাধুরী বললেন, ‘আমি ভারতীয় এবং এখানেই বড় হয়েছি। এখানে ফিরতে পেরে আমার খুবই ভালো লাগছে। মানুষের প্রতিক্রিয়াও খুব চমৎকার। আমি আমার ভক্তদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। ভারতে ফিরে প্রথম কয়েকদিন মানিয়ে নিতে হয়তো একটু সমস্যা হবে আমার স্বামীর। তবে আমার সন্তানদের নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই। এখানে নতুন বন্ধু-বান্ধব জুটে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’  

দেশে ফিরেই ‘ইশকিয়া’ ছবির সিক্যুয়েল ‘দেধ ইশকিয়া’তে কাজ শুরু করেছেন মাধুরী। এ ছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা মাধুর ভাণ্ডারকারের একটি ছবিতেও অভিনয়ের কথা-বার্তা চলছে। সবমিলিয়ে মাধুরী আবারো ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন রূপালি পর্দার কাজে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার আগেই রান্না বিষয়ক একটি রিয়েলিটি শোয়ের বিচারক হিসেবেও ৫ কোটি ভারতীয় টাকার বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। কাজেই বলা যায়, ছোট এবং বড় পর্দায় আবারো নিয়মিতভাবেই মাধুরীকে দেখার সুযোগ পাবেন দর্শকরা। মাধুরী ভক্তদের জন্য এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে!

  

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন