শুক্রবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১১

এভারগ্রীন শাম্মী কাপুর


এভারগ্রীন শাম্মী কাপুর

আশি ছুঁতে মাত্র বাকি ছিলো এক! খুব কি বেশি বয়স! শাম্মী কাপুরের জন্য আশি কোনো বয়সই নয়! বিশ্বাস হচ্ছে না! আজো মিডিয়া যখন হিন্দি চলচ্চিত্রের স্মরণ নেয়, কি রিমেকে, কি ছোট পর্দায়, কি কলের গান বাজানোতে; সেই শাম্মীই তো আজো পুরো পর্দা জুড়ে থাকেন! সেই যে- ইয়াহু, চাহে কয়ি ম্যুঝে জংলি কহে... কিংবা আজা আজা .... কি আজ-কাল তেরি মেরি পেয়ার কা ... পর্দায় আজো শাম্মীর প্রবল দাপুটে প্রাণবন্ত বিচরণ!

আর মাত্র এক বছর ডিঙোলেই আশি পূর্ণ করতেন। দাপুটে, প্রাণশক্তিতে উচ্ছল, নৃত্যপটিয়স এই মানুষটি দীর্ঘকাল বলিউড সাম্রাজ্য শাসন করেছেন একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে। ফাইনেস্ট অ্যাক্টর অনেকে বললেও ফাইনেস্ট এর চাইতে বলা ভালো আমৃত্যু রূপালি পর্দার দর্শকদের হার্টথ্রব ছিলেন। ভারতীয় ছবির রাজ্যপাটের রক অ্যান্ড রোল অধ্যায়ের যুবরাজ শমসের রাজ কাপুর; সিনেমায় যার নাম হয়ে গিয়েছিল- শাম্মী কাপুর।

নাম বলে নাম! ৫০ আর ষাটের দশকে দর্শকদের রাজাধিরাজ ছিলেন শাম্মী। ছিলেন এই অর্থে যে- এই ১৪ আগস্টে রেনাল ফেইলিয়রে মৃত্যুকে বরণ করেছেন ৭৯ বছরের চিরতরুণ শাম্মী কাপুর।

কিন্তু এ নিছকই শারীরিক মৃত্যু! আর একথাটি তাঁর বেলায় একশোভাগ খাটে। পর্দায় শাম্মী শতায়ূ। ৭ আগস্ট মুম্বাইয়ের ব্রিচক্যান্ডি হাসপাতালে ক্রনিক রেনাল ফেইলিয়র এর সমস্যা মানে কিডনির সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। পরিস্থিতি খুব যে ভালো ছিলো তা নয়, বরং মৃত্যুর আগের ক’দিনে ক্রমশ প্রাণের পারদ যেন নীচেই নামছিল। তা বলে মৃত্যুতে ঠেকে নেই তিনি। প্রাণ হারিয়ে চলে গেছেন বটে; কিন্তু আরো নিদেনপক্ষে শতবর্ষ রাজ্যপাট চালাবেন বলিউডের রক অ্যান্ড রোলের এই ‘এলভিস প্রিসলি’। এলভিস তাকে বলতো বলিউডের মানুষ-জন ভালোবেসেই। তাকে পেয়ে বলিউড পেয়েছিলো তার প্রথম নৃত্যপটিয়স অভিনেতাকে। শাম্মী কাপুরের নাচের দক্ষতা ছিলো অসাধারণ!
১৯৩১ সালের ২১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন শাম্মী, সেসময় নাটক আর চলচ্চিত্র নিয়ে ব্যস্ত বাবা পৃথ্বিরাজ কাপুর। পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান, রাজ কাপুরের ছোট ভাই শাম্মী কাপুর। যদিও জন্ম হয়েছিলো মুম্বাইতে। সেসময়কার বোম্বে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে- শাম্মীর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময়; বিশেষ করে শৈশবের একটা লম্বা সময় কেটেছিলো বাঙালী সমাজে। কলকাতায়। কলকাতাতেই শাম্মী মন্তেসরি আর কিন্ডারগার্টেন শেষ করেছিলেন। বাবা পৃথ্থিরাজ কলকাতায় চলচ্চিত্র আর নিউ স্টুডিওর নাটক নিয়ে মত্ত আর সেসময় কলকাতার জল-হাওয়ায় বেড়ে উঠছিলো শাম্মী কাপুরের শৈশব।

এরপর মুম্বাইয়ে ফেরা। মুম্বাইয়ে শাম্মী প্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন সেন্ট জোসেফস কনভেন্টে; এরপর ডন বসকো স্কুল। স্কুল জীবনের ইতি ঘটেছিলো নিউ এরা স্কুলের মাধ্যমে। এরপর মুম্বাইয়ের মাতুঙ্গায় রুইয়া কলেজে কিছুদিন পড়ালেখা করেছিলেন শাম্মী। অবশ্য এর কিছুদিন পরেই তিনি বাবার পৃথি¦ থিয়েটারে যোগ দেন। সিনেমায় ঢুকেছিলেন ১৯৪৮ সালে, জুনিয়্যর আর্টিস্ট হিসেবে। বেতন মাসে ১৫০ টাকা সাকুল্যে! চার বছর ছিলেন পৃথ্থি থিয়েটারে। ৫২ সালে শেষ যেবার বেতন তুলেছিলেন তা ছিলো টাকার অঙ্কে ৩০০ টাকা মাত্র!

শাম্মী কাপুরের বলিউডে অভিষেক হয়েছিলো ৫৩ সালে, জীবন জ্যোতি ছবির মাধ্যমে। পরিচালক ছিলেন মহেশ কাউল। শাম্মীর জীবনের প্রথম নায়িকা ছিলেন এ ছবিরই হিরোইন- চান্দ উসমানি। কাপুর পরিবারের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও প্রথমদিকে বলিউডি টিনসেলে খুব একটা সাফল্য চোখে দেখেননি শাম্মী। যদিও সেসময় মধুবালা, সুরাইয়া এবং নলিনীর মতো নাম-ডাকের অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। প্রথমদিকে শাম্মীর প্রায় সব ছবিই বক্সঅফিসে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
দর্শকদের কাছে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় আর অসাধারণ নৃত্যভঙ্গির জন্য সুপরিচিত শাম্মী কাপুর মনের দিক থেকেও ছিলেন শিশুর মতোই সারল্যমাখা সজীব প্রাণবন্ত এক মানুষ। একবার শাম্মী কাপুর সম্পর্কে বলিউডের হালের হার্টথ্রব রণবীর কাপুর বলেছিলেন, ‘শাম্মী কাপুরের নিজস্ব একটি স্টাইল আছে। তাঁর স্টাইল সবার চাইতে আলাদা; এতো বয়স হবার পরেও এখনও তারুণ্যদীপ্ত তিনি। শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও দারুণ স্বতঃস্ফূর্ত দিন কাটান তিনি।’

চির রোমান্টিক এই অভিনেতা নাকি কিছুদিন আগেও স্ত্রীকে নিয়ে প্যারিস যেতেন ছুটি কাটাতে! রোম্যান্টিক আর কাকে বলে! তার এই প্রস্থানে বলিউডের দীর্ঘদিনের সহকর্মী, সহ-অভিনেতা, অমিতাভ বচ্চন বলেছেন- ‘শাম্মী কাপুর বলিউডের অন্যতম সেরা এক নক্ষত্র হয়েই থাকবেন,... আনন্দ, আশা আর প্রাণোচ্ছলতায় পূর্ণ একটি জীবন, সবার ভালোবাসার সবাইকে ভালোবাসবার .... অকস্মাৎ নিভে গেলো।’

দিন আরো গড়াবে.. এভাবে মাস... বছর; কিন্তু বলিউডি ছবির তারকা প্রেরণা হিসেবে, চিরতরুণ এই অভিনেতা, যাকে সবাই একসময় ডেকেছিলো বলিউডের এলভিস প্রিসলি নামে; সেই শাম্মী কাপুর আরো অন্তত একশো বছর রাজত্ব করবেন বলিউডে একথা নিশ্চিন্তেই বলা যায়। এভারগ্রীন শাম্মী কাপুরের রাজত্ব ফুরোয় না। 

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন